মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৮

সংগ্রহ অনলাইন থেকে

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য ভুল স্বীকার করেননি ছারছিনার দরবার শরিফ এবং পীর পরিবারের লোকজন। ছারছিনার তৎকালীন পীর আবু সালেহের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনী মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর বরিশালের বিভিন্নস্থানে হত্যাযজ্ঞ চালায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দক্ষিণাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের সবচেয়ে বড় আস্তানা ছিল পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার ছারছিনার পীরের দরবার শরিফ।

এবারের স্বাধীনতা দিবসে পিরোজপুর পৌরসভা মিলনায়তনে রোববার দুপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হাবিবুর রহমানও ছারছিনার পীর পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ছারছিনার পীরের মাদ্রাসায় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারের ক্যাম্প ছিল। সেখানে রাজাকার সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে হত্যা এবং নারীদের ধর্ষণ করা হতো।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর সত্য আড়াল করতে ছারছিনার পীর শাহ মো. মহিবুল্লাহ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার শুরু করেছে উল্লেখ করে পিরোজপুরের পৌর মেয়র বলেন, গত ১৩ মার্চ পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ছারছিনা দরবার শরিফের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক মাহফিলের শেষ দিনে পীর শাহ মো. মহিবুল্লাহ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের মাদ্রাসায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ছারছিনা পীরের এই মিথ্যা ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যে প্রতিবাদ জানাই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে একাত্তরে গণহত্যা, লুটতরাজ, নির্যাতন অগ্নিসংযোগসহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। বাঙালি নারীদের গনিমতের মাল আখ্যা দিয়ে তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তুলে দিয়েছে পাক-সৈন্যদের হাতে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল পত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭১ এর ৬ মে পাক- বাহিনী স্বরূপকাঠিতে এসে আশ্রয় নেয় ছারছিনার দরবার শরিফে। ৭১ এর ঘাতক দালালরা কে কোথায় গ্রন্থে বলা হয়েছে, ছারছিনা দরবারে ৫শ’তাধিক তালেবে এলেম প্রায় ৩০টি মত গ্রামে হামলা করে লুট করে। পীরের নির্দেশে ছাত্র হিজবুল্লাহর নেতা মোহিবুল্লাহ নেতৃত্বে ইন্দের হাট বাজার জ্বালীয়ে দিয়ে লুটপাট করা হয়।

শুধু মুক্তিযুদ্ধেরর সময়ই নয় ১৯৫৪ সালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধীতা করেন ছারছিনার এ দরবার শরীফ। স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের ২৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়া থানা নিয়ে গঠিত আসনে তিনি প্রার্থী হলে মুসলিম লীগের নেতা ও মন্ত্রীরা ধর্ম সভা ডেকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ফতোয়া দিলেন যে, বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না। ধর্ম শেষ হয়ে যাবে। বড় বড় আলেম, পীর ও মাওলানা সাহেবদের সাথে ছারছিনার তৎকালীন পীর শাহ আবু জাফর মোহম্মদ ছালেহ ও তার লোকজন বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমান বিরুদ্ধে প্রচারে নেমেছিলেন। পীর সাহেবের সমর্থকরা টাকার লোভে রাতের আরামও দিনের বিশ্রাম ত্যাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বঙ্গবন্ধুকে পরাজিত করার জন্য।

১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় গণহত্যায় ঘৃর্ণ নায়ক ছারছিনার পীর গ্রেফতার শিরনামে এক সংবাদ প্রকাশ হয়। ছারছিনা থেকে গ্রেফতার করে তাকে বরিশাল সদরে নেয়া হয়। বরিশাল জেলে ২৩ মাস কারাবাসে ছিলেন তৎকালীন পীর আবু জাফর সালেহ। স্বাধীনতার পরবর্তীতে বর্তমান পীর মোহিবুল্লাহও প্রায় এক বছর আত্মগোপনে ছিলেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, নরঘাতক টিক্কা খানের আমলে ঢাকার ফরাসগঞ্জের লালকুঠিতে যে সকল পীর, মাদ্রাসার মোহান্দেস-মোদাররেস ও দক্ষীণপন্থী রাজনীতিক রাজাকার বাহিনী গঠন করা, প্রতিটি মাদ্রাসাকে রাজাকার ক্যাম্পে পরিণত করা এবং সকল মাদ্রাসার ছাত্রকে রাজাকার ও পুলিশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় শর্যিণার পীর সাহেব তাদের অন্যতম। বংশ পরম্পরায় টিকে যাওয়া শর্ষিণা দরবার শরিফের নাম বদলে হয়েছে ছারছিনা।

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান স্বধীনতা বিরোধী ছারছিনা পীরের হাতে স্বাধীনতা পদক তুলে দেন। এরশাদের সময়ে স্বরূপকাঠি উপজেলার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘নেছারাবাদ’। আবু জাফরের বাবা শাহ নেছার উদ্দিনের নামানুসারে এ নামকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বহুলোক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন অাহমেদের লেখাতেও শর্ষিণা পীরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান সম্পর্কে পরিস্কার উল্লেখ আছে। ১৯ ৭১ সালে হুমায়ূন আহমদের বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পিরোজপুরের এসডিপিও। দেশপ্রেমিক এই পুলিশ অফিসারকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অভিযোগে বলেশ্বর নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। ওইসময় অসহায় অবস্থায় হুমায়ূন আহমেদ আর তার ভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে নিয়ে তাদের মা আয়েশ ফয়েজ আশ্রয়ের জন্য স্বরূপকাঠির শর্ষিণার পীর সাহেবের কাছে যান।

এ প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শর্ষিণার পীর সাহেবের আস্তানা চমৎকার। জায়গাটা নদীর তীরে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। মাদ্রাসার ছাত্রদের থাকার জন্যে বিশাল হোস্টেল। পাড়া গাঁ’র মতো জায়গায় বিরাট কর্মযজ্ঞ। আর হবে নাই বা কেন? পাকিস্তানের সব রাষ্ট্র প্রধানই এখানে এসেছেন। কিছু সময় কাটিয়েছেন। আমরা ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে শর্ষিণা পৌঁছলাম বিকেলে। মাদ্রাসার ছাত্ররা দুধে রুটি ছিঁড়ে চিনি মাখিয়ে খেতে দিল। গপাগপ করে খেলাম। তাদের যে মিলিটারিরা কিছুই বলছে না এজন্যে তাদের মধ্যে আনন্দ ও উল্লাসের সীমা নেই। তাদের কাছেই জানলাম, পিরোজপুরের সঙ্গে শর্ষিণার পীর সাহেবের সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে। ক্যাপ্টেন সাহেব দিনের মধ্যে তিন-চার বার টেলিফোন করেন। অপারেশনে যাবার আগে পীর সাহেবের দোয়া নিয়ে যান। আমরা দু’ভাই মাদ্রাসায় ভর্তি হতে এসেছি শুনে তারা যথেষ্ট আনন্দ প্রকাশ করল। আমরা আমাদের পরিচয় প্রকাশ করলাম না। সঙ্গের মাওলানা সাহেব সন্ধ্যার আগে আগে আমাদের দু’জনকে পীর সাহেবের কাছে উপস্থিত করলেন। পীর সাহেব চারদিকে কিছু লোকজন নিয়ে গল্প করছেন। কাছে যাওয়ার সাহস হলো না। শুনলাম, মৌলানা পীর সাহেবকে নিচু গলায় কিছু বলছেন এবং পীর সাহেব রেগে যাচ্ছেন। সব কথা বুঝতে পারছি না। পীর সাহেব বেশিরভাগ কথার জবাবই দিচ্ছেন উর্দুতে। আমার বাবার প্রসঙ্গে কী কথা যেন বলা হলো। পীর সাহেব বললেন, আমি এই লোকের কথা জানি। বিরাট দেশদ্রোহী। ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যাও যাও, তুমি চলে যাও। মাওলানা সাহেব আরো নিচু গলায় সম্ভবত আমাদের দু’ভাই সম্পর্কে কিছু বললেন। পীর সাহেব ভয়ঙ্কর রেগে বললেন না, না। এদের কেন এখানে এনেছ? মাওলানা সাহেব আমাদের নিয়ে ফিরে চললেন। কী কথাবার্তা তাঁর হয়েছে তিনি কিছুই ভেঙ্গে বললেন না। নৌকায় করে ফিরছি এবং প্রার্থনা করছি খুব তাড়াতাড়ি যেন চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন